October 3, 2026

হুগলীর ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের তিনজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু

0
হুগলীর ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের তিনজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু

ন্যায় বার্তা অফিস ডেস্ক : সাংবাদিক – সন্দীপ হালদার : হুগলীর ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের তিনজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু, সুইসাইড নোটে চারজনের নাম—আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ

ঘরের দেওয়ালে লেখা কয়েকজনের নাম ঘিরে রহস্য, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও ঘটনা—তদন্তে হুগলি গ্রামীণ জেলা পুলিশ

নিজস্ব সংবাদদাতা, ধনিয়াখালি: হুগলির ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের তিন সদস্যের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ধনিয়াখালি থানার সোমসপুর দুলেপাড়া এলাকায় একটি বাড়ি থেকে বাবা, মা ও তাঁদের ১৭ বছরের মেয়ের দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, তিনজনের দেহ ঘরের ভিতর ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোট এবং ঘরের দেওয়ালে লেখা কয়েকজনের নামকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ ধনিয়াখালি থানায় ফোন করে খবর দেওয়া হয়, সোমসপুর দুলেপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে থাকা একটি পরিবারের তিন সদস্যের কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির দরজাও ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। খবর পেয়ে ধনিয়াখালি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে।

পুলিশের দাবি, বাড়ির একটি ঘর থেকে তিনজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। মৃতরা হলেন উত্তম চেইন (৫২), তাঁর স্ত্রী রূপা চেইন (৪৫) এবং তাঁদের মেয়ে অঙ্কিতা চেইন (১৭)। তাঁরা মূলত হুগলির ডানকুনির মোল্লাবের এলাকার দিল্লি রোড, ভাদুয়া, ঘোষপাড়ার বাসিন্দা বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত প্রায় ছয় মাস ধরে তাঁরা সোমসপুর দুলেপাড়া এলাকায় ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন।

ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে বলে জানানো হয়েছে। ওই নোটে চারজনের নাম রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। সেই চারজনকেই আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন একই বাড়ির মালিকের পরিবারের সদস্য এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আটক ব্যক্তিরা হলেন—মধুমিতা সিংহরায় (৩২), তাঁর স্বামী জয় সিংহরায় (৩৬) এবং মধুমিতার মা ইন্দ্রাণী সিংহরায় (৫০)। পুলিশ জানিয়েছে, মধুমিতা ওই বাড়ির মালিক। চতুর্থ ব্যক্তি রবিন মুর্মু (৬৫), সোমসপুর দুলেপাড়া এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সোনার সামগ্রী চুরি যাওয়ার একটি বিষয়ও রয়েছে।

ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে ঘটনাস্থলের দেওয়াল ঘিরে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাড়ির হলুদ ও সবুজ রঙের দেওয়ালে কয়েকজন ব্যক্তির নাম লেখা দেখা গিয়েছে। সেই নামগুলির সঙ্গে মৃতদের মৃত্যুর কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তবে দেওয়ালে লেখা নাম দেখেই ওই ব্যক্তিরা মৃত্যুর জন্য দায়ী—এমন কোনও সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছয়নি পুলিশ। একইভাবে, মৃত তিনজন সত্যিই আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাঁদের মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে—সেটিও তদন্তের বিষয়।

পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, মৃতদের সঙ্গে সম্পর্ক, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং নোটের সত্যতা—সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনটি দেহ ধনিয়াখালি গ্রামীণ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এটি নিছক আত্মহত্যার ঘটনা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে? দেওয়ালে কয়েকজনের নাম লেখা এবং সুইসাইড নোটে চারজনের নাম থাকার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আত্মহত্যা, প্ররোচনা, হত্যার সম্ভাবনা বা অন্য কোনও কারণ—কোনওটিকেই চূড়ান্ত বলে দাবি করা যাচ্ছে না।

হুগলি গ্রামীণ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ শুরু করা হয়েছে। আটক চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘটনার জেরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। একটি পরিবারের তিন সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যু স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মাত্র ১৭ বছরের কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুইসাইড নোট বা দেওয়ালে লেখা নামের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। পুলিশের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টই এই রহস্যের প্রকৃত কারণ সামনে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed